অবেলার ডাক
অবেলার ডাক
মুনমুন মুখার্জ্জী
কোথায় যাবেন তা জানেন না। স্বপ্নে রাত দশটার ট্রেন, সিনহা প্যালেস এমনি কিছু দেখে থাকেন। ছেলে অয়ন ঘরে থাকলে চোরের মত যেতে হত, সে এখন কলেজে হোস্টেলে তাই আপাতত তাঁকে বারণ করার কেউ নেই। তিনি স্বাধীন।
ঠিক দশটায় বাজার পর যে ট্রেনে ছাড়বে বলে মাইকে ঘোষণা করে তাতেই তিনি উঠে পড়লেন, ঠিক তখনি লাল ব্লাউজ আর বাসন্তি রঙের শাড়ি পরিহিত কারো স্পর্শে শিহরিত হলেন। কান্তি বাবু এমন কাউকে অনুসরণ করার স্বপ্নই দেখেছিলেন। আর ভাবনা নেই, উনি যেখানে যাবেন সেটাই গন্তব্যস্থল। ভদ্রমহিলার চোখ মুখ দেখতে চেষ্টা করলেও বিফল হলেন।
হঠাৎ ট্রেন থেমে গেলে ভদ্রমহিলা নামতেই তিনিও নামলেন। বর্ষাকাল, বৃষ্টি দেখে ব্যাগ থেকে বর্ষাতি বের করলেন। ভদ্রমহিলা ততক্ষণে একটি রিকশায় চেপে বললেন "সিনহা প্যালেস।" নামটা শুনেই তিনিও চটপট উঠে বসলেন।
কোথায় চলেছেন বুঝতে পারছেন না, কারণ বেশ অন্ধকার। চারিদিকে কোনো বসতি নেই। একটি সুসজ্জিত বাড়ির সামনে রিকশা দাঁড়ালে, মহিলা কান্তি বাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন "এলে তাহলে।"
এতক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধের মত বসেছিলেন কান্তি বাবু। এবার শুধালেন "কে আপনি?"
উনি বললেন, "এসো।"
ঘরের উজ্জ্বল আলোয় মহিলার মুখ দেখে তিনি চমকে উঠলেন, "বেলা না?"
"চিনতে পারলে তাহলে! শোনো, তোমাকে ডাইরিটা উপহার দেব বলে ডেকেছি, তোমার আমার কথা লেখা আছে। মন চাইলে পড়বে। বসো, চা আনছি।"
"তুমি নোলক পরলে কবে, এ সব তো.."
মায়াবী হাসি হেসে বেলা চলে গেল।
কান্তি বাবু ডাইরি পড়তে পড়তে স্মৃতিগুলো হাতড়াতে থাকেন। শেষের দিকে যা লেখা আছে তাতে বুঝলেন তাঁর প্রিয়তমা বাবা দাদার চাপে অজ পাড়াগাঁয়ে বিয়ে করতে বাধ্য হয়। কর্তা কোনোভাবে তার প্রেমের কথা জানতে পেরে অত্যাচার শুরু করে, জীবন সংশয়ের আশঙ্কায় সে মরমে মরে আছে।
তিনি ওর কষ্ট কি করে ভুলিয়ে দেবেন ভাবছেন ঠিক সেই মুহূর্তে দেখলেন, বেলার কাপড়ের আঁচল তার গলায় হঠাৎ জড়িয়ে শূণ্যে উঠে গিয়ে ঝাড়বাতিতে আটকে গেল। কান্তি বাবু প্রাণপণ চিৎকার করতে চাইলেন কিন্তু কিছু করতে পারলেন না। নিমেষে ঝাড়বাতি প্রচন্ড শব্দে আছড়ে পড়তেই তিনি জ্ঞান হারান।
গ্ৰামের লোকের চেষ্টায় জ্ঞান ফিরলে তিনি জানতে পারলেন, কয়েক মাস আগেই প্যালেসের কর্তা গিন্নির দুজনের ঘরের মধ্যেই মৃত্যু হয়েছে। কান্তি বাবু পরম মমতায় হাত বোলান বেলার দেওয়া শেষ উপহারে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন