বিশ্বাস অবিশ্বাস
বিশ্বাস অবিশ্বাস
মুনমুন মুখার্জ্জী
"মা আর হবে না, দেখো এবার থেকে তোমার কথাতেই সংসার চলবে; তুমি যা বলবে তাই আমরা সবাই করতে বাধ্য হব। শেষবারের মতন একবার তুমি সুযোগ দাও।"
অনেকক্ষণ ধরে রচনা দেবী ছেলের কথা শুনছিলেন, আর ধৈর্য ধরে থাকতে পারলেন না; বললেন, "অনেক হয়েছে বারবার আমি তোদের কথা বিশ্বাস করেছি, কিন্তু পরিণামে কিছু ফল হয়নি। তোর বাবা রেখে যাওয়া সমস্ত টাকা আত্মসাৎ করেছিস। কিছু বলতে গেলেই বলিস আমার টাকা শেষ হয়ে গেছে কিন্তু আমার তো চিকিৎসা বিমা করা আছে। আমার যা কিছু খরচ সেখান থেকেই তো উঠে আসে। তাহলে আমার রোগ-অসুখে কি করে সব শেষ হয়? যে টাকা ইনভেস্ট করা ছিল সেখান থেকেও তো প্রতিমাসে কিছু আসত সুদ বাবদ। এখন তো কিছুই পাই না। তুই আমার সঙ্গে জয়েন্ট হয়ে এখন আর আমার কোনো খেয়ালই রাখিস না। তাই আমি আদালতে তোর বিরুদ্ধে কেস করেছি, কারণ তোদের হাত তোলা হয়ে থাকতে আমার আর ভাল লাগছে না।
শরীরের তো ভরসা নেই। হতে পারে এক মাসের মধ্যে মারা যাব কিংবা হতে পারে আরো এগারো বছর বারো বছর; ঠিক নেই কতদিন বাঁচবো! আমার টাকা আমার কাছে থাকলে আমার সুবিধা। নিজেকে আবর্জনা মনে হবে না, আগাছা মনে হবে না। আমি আমার সমস্ত তোর হাতে দিয়েছি। কিন্তু তুই কি করলি? শোন তোর বাবা মারা যাওয়ার সময় ব্যাংকে কত ছিল তার একটা জেরক্স করে রেখেছি। আমার সেই এমাউন্ট-টাই চাই। যতদিন আমি বেঁচে থাকব সেটা আমি নাড়াচাড়া করব। আমি যখন থাকবো না তোদের হবে। আমি তোকেই লিখে দেবো। এখন তুই-ই আমাকে এনে দিবি তবুও তো আমার থাকবে। ব্যাঙ্ক থেকে আনার পরে খরচা বাবদ আমি তুলে দেবো তোর হাতেই। তবুও মাঝে মধ্যে কাউকে কিছু দিতে ইচ্ছা হতে পারে, কিছু কিনতে ইচ্ছা হতে পারে; কিন্তু কিছুই তো করতে পারিনা। ঘরের এক পাশে পড়ে আছি আবর্জনার মতো, দিনের পর দিন চলে যাচ্ছে। মনে হয় আমার শেষ নিঃশ্বাসটুকু পড়ার অপেক্ষায় তোরা হা-পিত্যেশ করে বসে আছিস। সত্যি করে বলতো তোদের কখনো কোনো বিষয়ে আমি বাধা দিয়েছি? তাহলে আমাকে নিয়ে তোদের এত অসুবিধা কেন? আমার টাকা আত্মসাৎ করে তোরা কি দেখাতে চাস? আমার টাকা কি তোর বোন এসে নিয়ে যাবে? তাকে যদি কিছু দেওয়ার থাকে সে আমিই দিতে পারি। আমার মেয়ে কিন্তু তবু সে নেবে না রে। সেও তোর ভালো চায়। আমার টাকার উপরে তার কোনো লোভ নেই। সে আসে, দেখাশোনা করে। তার বাড়িতে আমি যাব, সে আমাদের বাড়িতে আসবে, এটা তো স্বাভাবিক ব্যাপার। তার ঘরে গেলে তোর রাগ হয়; সে এখানে এলে তোর রাগ হয়। কেন?
একদিন যে ঘর তোর বাবা বানিয়েছিল, সে ঘর আজ তোর! আমার কোনো অধিকার নেই? তোর বাবা যখন ঘর বানিয়ে ছিল তো তুই ছিলিই না। তাহলে ঘরের অধিকার হঠাৎ করে তোর হয়ে গেল কেন?
এখনও তুই বলছিস বিশ্বাস করতে কিন্তু বিশ্বাস জোর করে আসে না রে। তোকে অনেকবার বিশ্বাস করেছি, তার বদলে তুই ঠকিয়েছিস। তোর বোনকে অপমান করেছিস, আর কেন? সংসার যেমন চলছে চলবে কিন্তু তবুও যদি আমার হাতে আর্থিক ক্ষমতা থাকে তাহলে তুই আর তোর বউ আমার উপর জুলুম করতে পারবি না। অন্তত যতদিন আছি ততদিন। আর যখন অথর্ব হয়ে যাব, তোদের মানসিক অবস্থা দেখে আমি আমার টাকা তোদের দেব না কোনো আশ্রমে দান করব সেটা ভেবে দেখব। আবার যদি আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করিস তাহলে আর কিছু বলার নেই আমার।
মোটকথা আমার সমস্ত কিছু আমাকে ফেরত দিতে হবে। তোর সাথে এই নিয়ে আর কথা বলতে চাই না। এক মাস সময় আছে। যার সাথে কথা বল দরকার বল। দরকার হলে তোর 'ভালো বাবা-মা'-র সাথে আলোচনা কর কিন্তু আমার সিদ্ধান্ত তোকে জানিয়ে দিলাম। জানিস তো বিশ্বাস অনেকটা নিঃশ্বাসের মতন, একবার বেরিয়ে গেলে তাকে আর ফিরিয়ে আনা যায় না।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন